Thursday, July 30, 2026

উচ্চস্বরে ভয় তাড়ানোর গান

আন্ত’জাতিক আইন-কানুনের প্রতি বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখিয়ে সব’শক্তিতে আমেরিকা-ইজরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করা এবং ইরান তার প্রতিঘাত দিতে শুরু করায় আরব-পারস্য এলাকা আজ রণক্ষেত্র।আলোচনা হয়, যুদ্ধ বিরতির হয়,বিরতির সুযোগে অস্ত্রভান্ডার বাড়িয়ে আবার আক্রমণ।সেই রণ-দামামায় পুড়ছে তেল-গ্যস , ধংস হচ্ছে অজস্র অবকাঠামো ,আবাস, শিক্ষায়তন, চিকিৎসা-সেবা কেন্দ্র হাসপাতাল উপাসনালয়, বাড়ছে লাশের সারি প্রতিদিন।গৃহহীন লাখ লাখ মানুষ বিপন্ন মানবতা চারিদিক। জ্বালানি তেলের বাজার উদ্ধ’মূখীতে গোটা বিশ্ব অথ’নীতি আজ টালমাটাল।বৃহদ শক্তিশালী দেশের কাছে ছোট ছোট দূব’ল দেশ গুলির সাবো’ভৌমত্ব এবং মানুষের নিরাপত্বা হুমকীর সম্মুখীন।বৈদেশিক মুদ্রার যোগানদাতা আমাদের লক্ষ লক্ষ ভায়েরা মা-বাবা,স্ত্রী-সন্তান আপনজনবিহীন চরম বিপদের মাঝে আটকে পড়েছে।দেড় দশক পর গনতান্ত্রিকভাবে নিবা’চীত সরকার এমনি শংকটময় মুহুত্তে’ আজ ক্ষমতায়।

নিবা’চনের বাজারে কিছু এমপি হতে চাওয়া নেতা এবং তাদের অনুসারী কমী’দের অতি উচ্চ স্বরে অতিবিচ্ছিরি অতি কদয’ অতি শ্রুতিকটু অনাকংখিত বচন শুনেছি এবং অতি-দৃষ্টিকটু অঙ্গ-ভঙ্গী দেখেছি । তাদের অনেকেই জনরায় না পেয়ে  নিবা’চনে হেরেছেন। দেশে এখন নিবা'চীত নতুন সরকার। নতুন সরকারের শপথের আগেই শুনেছিলাম বিএনপিকে ক্ষমতায় এক সেকেন্ড ও শান্তিতে থাকতে না দেবার ডাক। তাই দেখছি ক্ষমতায় বসতে না বসতে কেউ আর একটা জুলাই বিপ্লবের ডাক দিচ্ছে, কেউ আবার ক্ষমতাসীন বিএনপিকে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিচ্ছে।শিক্ষাঙ্গন দখলে নিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যানারে ছাত্র রাজনীতির বন্ধের আন্দোলনের নামে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ও শান্তি-শৃংখলা নষ্ট করার চেষ্টা দেখেছি।দেখেছি জ্বালানি তেলের ডিপোতে তেলের জন্য সুদীঘ’ লাইন,সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে ঘরে-বাহিরে বিষোধগার। কিন্তু সরকার-বিরোধীদলের কমিটির নাম না নিতেই সব লাইন দেখেছি হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে যেতে । আরও আছে  রসুনের কোষের মতো আকিকা ছাড়া  মুখোশের আড়ালে বাহারী নামের দলের দৃষ্টিকটু শ্রুতিকটু  হাক-ডাক ।এখন কথায় কথায় নতুন নতুন ইস্যু তৈরী করে রাস্তায় নেমে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।

মাঝে মাঝে বড় বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি।সত্তুরের আগের কথা। খুলনার বানিয়াখামারে বাড়ির সামনের রাস্তা  কাচামাটির  এবং এলাকাটিতে  তখন তেমন  জনবসতি ছিল না। রাস্তার দু’পাশে ঘন কাটাবনের  জঙ্গল। তার পাশে একটা  বিশাল বড় শীল কড়ই গাছ ।পাশে খালি ছোট এক টুকরা মাঠ পাশ দিয়ে বয়ে চলা খাল, জোয়ার-ভাটায় পানি ওঠা-নামা করে। সেই শীল কড়ই  গাছের গভীর ছায়ায় ভড় দুপুরেও তার নীচে রাতের মতো অনুভূত হত, ভয় লাগতো।বিদ্যুৎ ছিল না।রাতে পরিবার গুলি কেরোসিনের কুপি বাতি বা হারিকেন বাতির  উপর নির্ভর ছিল।অন্ধকার রাতে ভয়ংকর মনে হওয়ায় রাস্তায় চলাচল করতে বড় বেশি সাহসের প্রয়োজন ছিল। ঘড়ের পশ্চীমের জানালা খুললে দেখা যেত শীল কড়ই গাছ।ভাই-বোন সবাই ভয় পেতাম । তাই সন্ধ্যা না হতে জানালা বন্ধ রাখা হতো। সন্ধ্যার পর রাস্তা  দিয়ে ঘরে ফেরা দ্রুত ধাবমান কারো না কারো যাওয়ার সময় প্রতিদিনই ঘরে বসেই অতি উচ্চস্বরে  অসংলগ্ন বেসুরো গলার গান শুনতে পেতাম। কৌতূহলী হয়ে কেন তারা এমন ভাবে গান গায় একবার মা এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম । তিনি বলেছিলেন যে তারা  অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ভীষণ ভয়ে থাকে  আর সেই ভয় মন থেকে তাড়াতেই উচ্চ স্বরে তাদের ভয় তাড়ানোর গান গাওয়া। তিনি অনেক আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তার সে কথা এত বছর পরও আমার মনে রয়ে গেছে।

আজ বিভিন্ন নেতা-কমী’ তাদের অনুসারীদের বচন-বাচন হাক-ডাক শুনে  অনেক আগের সেই বিশাল বড় শীল কড়ই  গাছ পার  হতে থাকা ভীত ধাবমান পথচারীদের ভয় তাড়ানো গানের কথা মনে পড়ছে। কারণ হাদীর খুনী ধরা পড়ছে না কেন তার বিচার নিশ্চিত করছে না কেন , বিএনপির একজন প্রবীন নেতাকে সেই খুনের আসামী করে তাকে চাদাবাজ বলে তিরস্কার করতে করতে তাকে মৃত্যুর মুখে দাড় করিয়ে ক্ষান্ত দেয় নাই।তার মৃত্যুও কামনা করেছে।নেতার নাম ধরে চিৎকার করে বক্সিং মেশিনে সজোরে ঘুষি মারতে দেখেছি।কমী’দের দিয়ে নেতা-নেত্রী,তাদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য ফটোকাড’ সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে প্রপাগান্ডা করেছে।আইনী ব্যবস্থা নিলে দলের বড় নেতারা বাকস্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছেন।হাদীর খুনের আসামী যখন ভারতে ধরা পড়েছে এবং সরকার যখন তাকে আনার  চেষ্টা করেছে তখন দেখেছি আবার আওয়াজ তুলছে জজমিয়া নাটক নতুন করে সাজিয়ে সরকার তাদের অনেক নেতাকে আটকাতে পারে। প্রশ্ন জাগতেই পারে এরা কি নিজেদের কোন অনৈতিক কম’কান্ডের কারণে মনে মনে ভয় পাচ্ছে, তারা কি কোনো না কোনো ভাবে কোনো অপরাধে জড়িত থাকায় নিজেদের অপরাধী ভাবছে? ভয় তাড়ানোর জন্য তারা কি উচ্চস্বরে, অস্বাভাবিক অশালীন শব্দ চয়ন করে  তাদের ভেতরের সেই উদ্বেগ সেই ভয় ভুলে থাকবার  চেষ্টা করেছে?

আমরা এখন আর  কেউ কমী' অনুসারী কিংবা দশ'ক নই, চাই সবাই এখন নেতা হ'তে। বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিষ্ট সরকারের নেতা কমী’ এবং জুলাই বিপ্লবের কিছু নেতা কমী’দের অবস্থা দেখে সবাই এখন ধরেই নিয়েছে নেতা  হওয়া মানেই অতিদ্রুত  গাড়ি -বাড়ির মালিক, নিশ্চিত কোটিপতি। জন-মানুষের প্রকৃত নেতা হতে হলে নিজেকে আগে পরিশুদ্ধ করতে হবে ভাবছি না। নিজেকে অন্যদের থেকে যোগ্য হতে  হবে ভাবছি না।নেতা হতে হলে নম্র-ভদ্র বিনয়ের সাথে  সম্মান দিতে এবং সম্মান নিতে শিখতে হয়, মাটি ও মানুষের ভালোবাসা পাইতে হয় ভাবতে চাই না।অশ্লীল অশালীন আচার-আচরণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ভদ্রতা -নম্রতা, শালীনতার আবহ নষ্ট করে নেতা হবার নয়,নেতা হতে হলে ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রয়োজন।মব তৈরি করে, উচ্চস্বরে চার হাত পা ছুড়ে আস্ফালন  করে হাস্যরসের যোগান দিয়ে কিছু মানুষের উচ্ছ্বাস, শীৎকার আর  হাত তালিতে নেতা হওয়া সম্ভব হলে, রাস্তার  ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যারা চুলকানির মলম বিক্রি করে তারাও কি হতে পারতো না যোগ্য নেতা?

আসুন শালীন অশালীন বোঝার চেষ্টা করে আমরা ভদ্র হবার চেষ্টা করি।শান্তি –সম্প্রীতির পরিবেশ মজবুত করি। শংকরের কোনো এক লেখায় পড়েছিলাম মন যা চায় তা করতে পশুও চায় পাথ’ক্য মানুষের আছে সংযম পশুদের তা নাই।তাই মনকে বোঝাতে হবে অকস্মাৎ  রাত না পোহাতে শ্রদ্ধাহীন ভালোবাসাহীন ঘৃণা আর আতংকের দানব হওয়া যায়, জোকার, ভিলেন হওয়া যায় কিন্তু জন-মানুষের  শ্রদ্ধার পাত্র, প্রাণের নেতা  হওয়া যায় নারে পাগলা। তবুও কেন জানি  চারিদিকে দেখি  বসেছে পাগলের মেলা।এমন লক্ষণে বারবার প্রতারিত হয়ে দেশের  ভবিষ্যত ভাল হবে  আশা করতে পারি কিভাবে ?

নতুন সরকার দেশের বেহাল অবস্থায় হাল ধরতে চাইছেন।সরকারের ভুলত্রুটির গঠনমূলক সমালোচনা হবে সংশোধনের সময় দিতে হবে।দেশের ভেতরে জঙ্গী তৎপরতার হুমকীর কথা উঠছে,প্রতিবেশী দেশের পশ্চীম বাংলায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার, দেশের ভেতর ভারতপ্রেমীদের আস্ফালন,ডিসেম্বরে আসতে চাইছে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার, জাতিসঙ্ঘে অগাষ্টিনা চাকমাদের দেশ বিরোধী মিথ্যাচার, পাহাড়েও অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির ষড়যন্ত্রের আলামত।ভাবতে হবে ইরানের মতো সরকারকে বিব্রত করতে কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের আমাদের কেউ কোনো ভুমিকা রাখছি কিনা। ক্ষত-বিক্ষত ইরানকে সামনে রেখে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কারো মাসে'নারি হয়ে কাজ করবো নাকি দেশ প্রেমিক হয়ে দেশের সাবো’ভৌম রক্ষা করা ও দেশের মানুষের শান্তির জন্য কাজ করবো ? সময় এখনই দেশ-প্রেমিক হতেই হবে, আর কোন বিকল্প নাই।

https://www.youtube.com/channel/UCO9Em15PgixJY8mgVh78rjA

প্রকাশ : দৈনিক গণ্মুক্তি  ৩০/০৭/২০২৬ ইং