Tuesday, March 24, 2026

অভিবাদন

সারারাত তার চোখে ঘুম আসেনি।সকালে উঠবো উঠবো করে ওঠা হয় নাই।লাবনী তাকে কয়েকবার ডেকেছে সে ওঠে নাই।বার বার ডেকেও ওঠাতে ব্যথ’ হয়ে ঝাড়ি দিয়ে চুপ হয়ে অপেক্ষা করেছে তাতেও কাজ হয় নাই।আজ  রায়হানের রাতের বাসে গ্রামের বাড়ী যাবার কথা। কয়েকদিন থাকতে হবে।ঘড়ে বাজার সদাই লাগবে তাই রাতেই সব লিষ্ট করে রেখেছে। লাবনী হাতে পানির গ্লাস নিয়ে নাখে মুখে ছিটাতে সে উঠে বসে । চোখ মেলে দেখে আধো ঘুম আধো জাগায় না খেয়ে ঘড়ির কাটা ১১টার ঘর ছুই ছুই করছে।বাজারে যেতে হবে।ভাবছে বাজারে এখন নাকি বিকালে। সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিল এক মিনিট। ছেলে মেয়েরা স্কুলে।লাবনীর মুখ থমথমে দেখে পাশে গিয়ে বসে।সাড়া না পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাছে টানে।লাবনী ঢং না করে নাস্তা খেতে তাগাদা দেয়।পেটে ইদুর বিড়াল ছোটাছুটি করছে।রায়হান বাধ্য শান্ত ছেলের মতো আদেশ পালন করতে দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে নাস্তা খেতে বসে।রাতে তৈরী করা বাজারের ফদ’ লাবনী হাতে ধরিয়ে দিলে তা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে।বাজারের জিনিসপত্রের দামে মাথায় ঝিম ধরে।কিন্তু উপায় নাই বউ-ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে হবে বাচার জন্য চলার জন্য নিজেকেও খেতে হবে।কেনাকাটা করে ফিরতে ছেলে-মেয়ে স্কুল থেকে ফিরেছে। বাসার কাছে স্কুল, বাচ্চারা একাই যাওয়া আসা করে অসুবিধা হয় না।

দুপুরে খাওয়া সেরে একটু ঘুমিয়ে নিলে ভালো হতো।ছেলে-মেয়ে এই প্রথম তাদের বাবা ছাড়া থাকবে তাই কাছ থেকে নড়ছে না।চলছে নানা কথা সাথে নানা রকম বায়না।লাবনী টেবিল পরিস্কার করতে করতে তাদের বায়নায় সায় দেয়।কিছু সময় পর  লাবনীও এসে বসে। কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়। লাবনী উঠে হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করে। সময় গড়িয়ে চলে তার আপন গতিতে।বাসের সময় রাত ১২.০০টা। দশটা বাজতে আজ সবাই একসাথে রাতের খাবার খেতে বসেছে । বউ ছেলে মেয়ে কারো যেন কথা ফুরায় না। খাওয়া সেরে আর অপেক্ষা করে না। দ্রুত নিজে তৈরী হয়, ছেলে মেয়ের মুখটা মলিন , দুজনকে  বুকের দুপাশে জড়িয়ে আদর করে বেড়িয়ে পড়ে। একটু হাটতে হবে বড় রাস্তায় উঠতে। গলি রাস্তার দুপাশের পরিবেশ ভালো না জেনেও কম ভাড়া দেখে উঠে পড়েছে। বড় সুবিধা ছেলে-মেয়ের স্কুলটা কাছে লাবনীরও সময় বাচে সাথে কিছু টাকাও। তার অফিসও বেশি দূরে নয়।পায়ে হেটে আসা যাওয়া করে।মাস শেষে রিকশা ভাড়ার কিছু টাকা তার বেচে যায়,সাথে শারীরিক একটু ব্যায়াম হয়।

এখন গলি রাস্তায় মানুষজনের চলাফেরা খুব একটা নাই।হাঁটার সময়  সে তার চোখ কান খুব সতর্ক রাখার চেষ্টা করছে।আগে এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতে শুনেছে। সে কখনো তার মুখোমুখি হয়নি।জীবনে একবারই  কয়েক বছর আগে ছিনতায়ের কবলে পড়েছিল। মৃত্যুর আগ পয্য'ন্ত সেই ঘটনা ভুলতে পারবে না।তারপর থেকে রাস্তায় সবসময় অন্ধকার জায়গা এড়িয়ে চলে। কিছুটা সামনে অন্ধকারে মেয়েলি কান্না জড়িত "মাগো" শব্দে সতর্ক হয়।হাঁটতে হাঁটতে ঘটনাস্থলের কাছে এসে দেখতে পায় ১৪/১৫ বছরের বয়সের একটি ছেলে একটা মেয়েটি মারছে। মেয়েটি কাঁদছে আর বলছে, "তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছো আমি মায়ের কাছে ফিরে যাব। সামনের বাড়িতে সে লক্ষ্য করল, একজন মহিলা অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি এড়াতে তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে বাচতে চাইছে। সামান্য লাইটের আলোতে মেয়েটিকে সুন্দরী কিশোরী মনে হল। এমন বয়সে বাবা-মায়ের স্নেহ ভালোবাসায় মেয়েটির থাকার কথা। অথচ অন্ধ প্রেমে ছেলেটির উপর বিশ্বাস করে বাবা-মা ছেড়েছে। পরিণতি রাতে রাস্তায় মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার মূল্য দিতে হচ্ছে। ভাবছে এই বয়সে তারা ছেলে-মেয়ে একসাথে  দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট খেলেছে। এখন ডিজিটাল যুগে খুব দ্রুত ছেলে-মেয়েরা প্রেম-ভালবাসা বিয়ে সংসার করা বুঝে গেছে। সেও না দাঁড়িয়ে দ্রুত পার হয়ে এসেছে । বড় রাস্তায় এসে পড়লে সিএনজি ঠিক করে তাতে উঠে দ্রুতই বাস কাউণ্টারে চলে আসে। মোবাইল আসায় ঘড়ি পড়া হয় না।মোবাইলে সময় দেখে এখনো অনেক সময় আছে।পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগার বের করে ঠোটে চেপে আগুন জ্বালায়। উন্মুক্ত রাস্তায় ধূমপান করা নিষিদ্ধ কিন্তু কাউকে মানতে দেখে নাই, সেও আজ আইন মানতে চাইছে না ।

মায়ের শরীর খারপ তাই না জানিয়ে দেখতে যাচ্ছে। মাকে কাছে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু বউ শাশুড়িকে মেলাতে পারে নাই। কেউ যেন কাউকে সহ্য করতে পারে না। সে নিজেই এখন শাখের করাত যে দিকে যায় সেদিকেই কাটে। ভীষণ কষ্ট হয় ,বড় বেশি একাকি মনে হয়। নিজেকে অপরাধী ব্যথ’ মনে হয়। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে যতটুকু শান্তি। মাঝে মাঝে শংকা জাগে বৃদ্ধ বয়সে তাকেও কি তার মা-বাবার মতো এভাবেই থাকতে হবে। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। চলমান গাড়ীর চেয়ে পিঁপড়ার গতি এখন অনেক বেশি মনে হয় তার।সামনে সারিবদ্ধ যান্ত্রিক পিঁপড়ার আলো ঝিলিমিলি সারি দেখতে ভালোই লাগছে। মোবাইলে তাকিয়ে দেখে সময় হয়ে গেছে তাই বাসে নিজ আসনে গিয়ে বসে।রাস্তায় এখনও মানুষের ভীড়। ভাবছে সীমিত আয়ের মানুষের এই শহরে জীবন কাটানো দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তার ধারণা আগামীতে এই মেগা সিটি কেবল ধনী এবং ভিক্ষুকদের জন্যই থাকবে। ঢাকায় থাকার যোগ্যতা দিন যেন সে হারিয়ে ফেলছে। 

সাধারণতঃ ট্রেনে বাসে যাতেই যাত্রা করে না কেন  অপেক্ষা ছাড়ার দেরি আর সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করা বাকি।রায়হান আজ কেন জানি চোখ বন্ধ করতে পারছে না। মাথাটা ঝিম ধরে আছে। আসার পথে ক্রন্দণরত মেয়েটার মুখ ভেসে উঠছে। ক’বছর পর তার নিজের মেয়েটারই বয়স এমনি হবে হয়তো।নিজেকেই অপরাধী মনে করে প্রশ্ন করছে কেন সে এই পরিস্থিতি এড়িয়ে আসলো । কেন আমরা আমাদের নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছি ? কেন আজ আমরা খোলা মনে হাসছি না ? কেন দুঃখ ভুলে যাওয়ার জন্য নিজেরা জোরে কাদতে পারি না?কেন আমরা বাচ্চাদের সমস্যা সমাধান দূরে থাক সমস্যা জানতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না? তারা যদি ভুল করে থাকে তাদের কেন পরামর্শ দিতে পারি না তাদের শাসন করার সাহস পাই না? আজ আমাদের কোনও আত্মীয়ের এই পরিস্থিতিতে আমরা কী চুপ থাকতাম?নিশ্চয়ই না।

সমাজে আগে মুরুব্বীদের সম্মান করা হত গুরুত্ব দেওয়া হতো। মুরুব্বীদের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল ছিল।কেউ তাদের সামনে অন্যায় করতে সাহস করতো না।এলাকার মাতব্বর থাকতো সরদার থাকতো তারাই বিচার কায’ করতেন। ডিজিটাল যুগে সব আজ এলোমেলো। এখন এলাকার মাস্তান-সন্ত্রাসী-চাদাবাজদের আমরা বিচারক মানি একটু কিছুতেই থানা পুলিশ করি। ব্যক্তিগত সমস্যাকে রাজনৈতিক রং মাখাই ধমে’র রং মাখাই। সে আর ভাবতে পারে না।বাস তার তার দীঘ’ যাত্রায় ক্ষনিক বিরতিতে হোটেলে থেমেছে।রায়হান নামবে কি নামবে না ভাবতে  শুরু করেছে। আজকাল সে কেন জানি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। নামতে গিয়ে হোচট লাগে।  ওয়াসরুম সেরে আবার বাইরে এসে দাঁড়ায়।  

এতো রাতে এক বৃদ্ধ লোককে লম্বা বাঁশের লাঠিতে জাতীয় পতাকা ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে  দেখে,মনে পড়ে সামনে ২৬শে মাচ’ দেশের স্বাধীনতা দিবস। ঢাকায় মুজিব ইয়াহিয়ার আলোচনার মাঝেই মুক্তিকামী বাংগালী নিধনের পরিকল্পনা করেছিল। সেভাবেই প্ল্যান করে ” অপারেশন সাচ’ লাইট” নাম দিয়ে  তা বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন পশ্চীম পাকিস্তান থেকে চট্টগামে জাহাজযোগে এবং করাচী থেকে বিমানে সেনা-সরঞ্জাম আনা শুরু করেছিল। সব ব্যবস্থা চুড়ান্ত হলে ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ছেড়ে করাচী চলে যান।২৫শে মাচ রাতে পাক হানাদার বাহিনী ”অপারেশন সাচ’লাইট”চুড়ান্ত বাস্তবায়ন করতে প্রথমেই  শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে তৎকালীন পশ্চীম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাংগালী জাতির কন্ঠ স্তব্ধ করতে রাতের আধারে ট্যাংক-সাজোয়া যান অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গণহত্যায় ঝাপিয়ে পড়ে ইপিআর পিলখানা ব্যারাক, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, নিলক্ষেত বিশ্ববিদ্যালয় সহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর। ট্যাংক- মটারের গোলায় চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় বিভিষিকাময় হয়ে যায় ঢাকা নগরী । রাস্তায় রাস্তায় লাশের সারি। ঘটনার আকস্মিকতায় রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ দিকভ্রান্ত সব আত্মগোপনে।

জিয়াউর রহমান তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ৮ম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর সহকারী কমান্ডিং অফিসার।কমান্ডিং অফিসার লেঃকণেল জানজুয়া তাকে ২৫শে মাচ’ রাতে বন্দরের সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে পাঠিয়ে পথে জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।পথিমধ্যে জিয়া রাতে ঢাকার নৃশংশতার খবর, সেনানিবাসে গোলাগুলির খবর জানতে পেরে অস্ত্র খালাসে না গিয়ে সঙ্গী পাকিস্তানী হানাদারদের গ্রেফতার করে ফিরে এসে সেনানিবাসের বাসা থেকে কমান্ডিং অফিসার জানজুয়াকে গ্রেফতার করে ষোলশহর ব্যারাকে এনে হত্যা করেন। চট্টগ্রাম ষোলশহর ব্যারাকে মীর মেজর শওকত,ক্যাপ্টেন অলি আহম্মেদ, ক্যাপ্টেন শমশের মবিন চোধুরী, লেফটেন্যান্ট খালেকুজ্জামান সহ অনান্য অফিসার ও সিপাহীদের নিয়ে “উই রিভোল্ট” বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৬শে মাচ’সকালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে সশস্ত্র স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সেই ঘোষণায় সারাদেশব্যপী জাতি আবার জেগে উঠে। শুরু হয় পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সশস্র মুক্তিযুদ্ধ। দীঘ নয় মাসের যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণের রক্তে, হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানীদের হাত থেকে মুক্ত হয় আমাদের মাতৃভু্মি বাংলাদেশ।আজ সেই  স্বাধীনতার ঘোষক  এবং পরবতী’তে বাংলাদেশের ইতিহাসের সফ্ল রাষ্ট্র নায়ক জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক রহমান জনগণের ভোটে নিবা’চিত দেশের প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় বসতে না বসতেই চারিদিকে কেবলই ষড়যন্ত্র। ভাবে জাতি হিসাবে আমাদের দূ’ভাগ্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি নাই।ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় বিশেষ কোন দিনই দল-মত, জাতি-ধম’-বণ’নিব্বি’শেষে পালন করতে পারি নাই। আমরা এখন জনে জনে, ঘরে ঘরে, দলেদলে বিভক্ত। একদলের আনন্দ উৎসব হলে আরেক দলের শোক দিবস। একদল হ্যাঁ বলতে না বলতে আরেক দলের না হয়ে যায়। একটু এগিয়ে হাতে ধরা একটা ছোট জাতীয় পতাকা কিনে বাসে গিয়ে বসে।

বাস ছাড়তেই পাশের জানালার পদা’ সরিয়ে অন্ধকারে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না। সুপারভাইজারের ডাকে  জেগে চোখ খুলে দেখে বাস ফাকা সবাই নেমে পড়েছে। নিচে নেমে সিএন জি ডাকে, গন্তব্য এখন মায়ের ঠিকানা। বাড়ির গেটের সামনে আসে। আজ ব্যতিক্রমী একটি দিন। কখনই না জানিয়ে এভাবে মায়ের কাছে আসে নাই।কলিং বেল টেপার আগে জাতীয় পতাকা গেটে লাগিয়ে দেয়। গেট থেকে এক ধাপ পিছিয়ে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় দেশের স্বাধীনতার জন্য, দেশের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করে যাওয়া বীর সেনানীদের প্রতি ।মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রাথ’না করে হে আল্লাহ তুমি বহুধাবিভক্ত জাতীকে গবী’ত দেশ-প্রেমিক একতাবদ্ধ জাতিতে পরিণত করে দাও।

 https://www.youtube.com/channel/UCO9Em15PgixJY8mgVh78rjA

No comments: