ছোট বেলায় আমাদের অনেক কিছু শেখানোর সাথে ছোট ছোট কিছু ছড়ার মাধ্যমে আদব-কায়দা শেখানোর চেষ্টা হতো। তেমনি একটা ছড়া ছিল “শিশুর পণ” সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে। ক্লাসে পড়া না পারলে অথবা নিয়ম-কানুনের ব্যত্যয় ঘটলেই স্যারের বেতের বাড়ি, হাতের তালুতে ডাষ্টারের বাড়ি,টেবিলের নিচে মাথা দিয়ে শাস্তি কিংবা টেবিলের উপর কান ধরে দাঁড়িয়ে শাস্তি দেয়া আবার সেই স্যারের পরম আদর স্নেহ ভালোবাসা জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।আজকের দিনে কোনো টিচার, কোনো ছাত্র, কোনো অবিভাবক তা কল্পনা করতে পারবেন তা মনে হয় না। জুলাই বিপ্লবের পর দেখেছি স্কুলে প্রধান শিক্ষককে কিংবা কলেজ অধ্যক্ষকে ছাত্ররা তিরস্কার-কুটুক্তি করে শারীরিক হেনস্থা করে তাদের পদত্যাগে বাধ্য করতে।বিশ্ববিদ্যালয় তা থেকে বাদ যায় নাই।শোনা যায় একটা বিশেষ দল ইনটেরিম সরকারের উপদেষ্টাগনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্ট্ররে তাদের পছন্দের লোক বসানো সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের ভিসি নিয়োগ দিয়েছিলেন। জুলাই বিপ্লবের পর দুবছর অতিক্রান্ত হ’তে চলেছে।সতের মাসের ইনটেরিম সরকারের তত্বাবধানে নিবা’চনে সুদীঘ’১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে গনতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের সরাসরি ভোটে নিবাচীত সরকার ক্ষমতায় বসেছে যার বয়স তিন মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে।
এ লেখা যখন লিখছি তখন গাজিপুর ঢাকার ডুয়েট এ চলছে ছাত্রদের কম্পিলিট ব্লকেড।কারণ সরকার সেখানে সিলেটের শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন অধ্যাপক সাহেবকে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে রাষ্টপতির অনুমোদনে নতুন ভিসি হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন,যা তথাকথিত সাধারণ ছাত্রদের পছন্দ নয় । তাকে তার কম’ক্ষেত্রে যোগদান করতে দেয়া হচ্ছে না।এখন বড় প্রশ্ন কে ভিসি হবে তা নিদ্ধা’রন করার যোগ্যতা ক্ষমতা দেখানোর ধৃষ্টতা দেখানোর সু্যোগ ছাত্ররা কিভাবে পেল? দেখেছি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যানারে তিতুমীর কলেজ, ইডেন কলেজে হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলন।দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট মিটিং চলাকালীন ডাকসু নেতারা অশালীনভাবে ঢুকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে এবং ভিসির সাথে বাদানুবাদ জড়াতে।যেখানে সিন্ডিকেট মিটিং চলমান সেখানে সিদ্ধান্ত কি হয় সেটার অপেক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনে ডাকসু ভিপি সাদিক কাইয়ুম অন্য কাউকে সাথে নিয়ে ভিসির সাথে আলাপ আলোচনা করতে পারতেন কিন্তু করেন নাই। সোস্যাল মিডিয়া প্রচার প্রচারনা থেকে জানা যায় বত'মান ভিসি সাহেব ডাকসু নেতাদের পছন্দের নয়।তাই আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে একটা ইস্যুকে সামনে এনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে ভিসি সাহেবকে বিতর্কিত' করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাক-স্বাধীনতার নামে দেশে লাগামহীন অশালীন–অশ্রাব্য গালিগালাজ,কুরুচিপূন’ অংগভংগী সহ শিক্ষক-অবিভাবক সিনিয়রদের অপমান অপদস্থ করার এক নতুন সংস্কৃতি চালু হয়েছে।পথে-ঘাটেতো বটে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এমনকি স্কুলের আঙ্গিনা আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। সময় এসেছে অবিভাবকদের তাদের সন্তানকে শুধু পড়াশুনার জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে হবে না ।মাসে মাসে তার খরছের জন্য রক্ত-ঘাম পানি করা টাকা পাঠালেই হবে না।তারা সাবালক হয়েছে তারা ভালোমন্দ বোঝে ভাবলেও হবে না।তাদের এখন খোজ-খবর রাখা অতি জরুরী হয়ে পড়েছে।তারা কাদের সঙ্গ দেয় , ক্লাসে উপস্থিত থাকছে কিনা জানতে হবে।তাদের রাস্তায় নয়, রাতে কোনো অপরাধপ্রবন এলাকায় নয়,তাদের পড়ার টেবিলে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়ায় আমাদের অনেক সন্তানদের নিয়ে কথা উঠছে তাদের অনেকের অশ্লিল বক্তব্যের ভিডিও, অশ্রাব্য শ্লোগানের প্ল্যাকাড’ হাতে ছবি পত্র-পত্রিকা-সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে আছে। আমরা অবিভাবক হিসাবে দেশের ভবিষৎ প্রজন্মকে ধংসের হাত থেকে বাচানোর জন্য সেই সন্তানদের দিয়ে সংশোধনের সুচনা করতে পারি।যদি আমরা পারবারিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে না পারি শুধু প্রশাসন দিয়ে সব জঞ্জাল সরানো যাবে না , সব সমস্যার সমাধান আশা করাও যাবে না।
আমরা সত্যি বড় বিচিত্র জাতি। ঢাকা সহ সারা বাংলাদেশে অপরাধের আখড়া কোথায় কোন রাস্তার কোন এলাকার কোন গলিতে কম বেশি সবাই জানে।সন্ধ্যা দূরে থাক ভালো নিরীহ মানুষ দিনের বেলায়ও সব সময় সেই সব এলাকা এড়িয়ে চলেন।তেমনি ঢাকা শহরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যে ভালো না সবাই জানে। রাতে সেখানে যাবার ভালো কোন কারণ থাকতে পারে কি ? হাতুড়ি নিয়ে সেখানে যাবার উদ্দেশ্যও ভালো হবার কথা নয়।আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর যে কোনো অনুসন্ধানী প্রশ্ন শুনে উগ্রতা দেখছি, কথায় কথায় জুলাই আন্দোলনের কথা বলে তাদের উপর চড়াও হতে দেখছি।আমরা অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমাদেরই সন্তান যাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছি সেই সন্তানেরা রাতে তাদের সহপাঠিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেনস্থা করার অজুহাতে অশ্রাব্য অশালীন শ্লোগান তুলে মাদক নিয়ন্ত্রন ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী অফিসারের অপসারনের দাবীতে পড়াশুনা রেখে থানায় জড়ো হতে দেখেছি।
দেশের অগ্রগতি ও দেশের শান্তির জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষিত সুনাগরিক। দেশের রাজনৈতিক দলের নেতাদের উচিৎ ছিলো বিপ্লবের পর ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ফেরানো এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করা।কিন্তু করা হয় নাই।বরং চর দখল করার মতো একদল গেছে আর একদল শিক্ষাংগনের দখল নিয়েছে আবার হয়তো অন্য কারো দখল নেবার চেষ্টা হবে।কথায় কথায় মব হচ্ছে পড়াশোনা চাইতে অশোভন অশ্রাব্য গালিগালাজ উন্নয়নের গবেষণা চলছে।কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের তাদের অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কমী’দের রাস টানবার চেষ্টা দেখা যায় নাই। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় এসবই বুমেরাং হয়ে নেতাদের গলা টিপে ধরে বলতে পারে জুলাই বিপ্লবের পর জুলাই যোদ্ধারা যেভাবে ইনটেরিম সরকারের উপদেষ্টাদের বলেছিল আমরাই আপনাদের উপদেষ্টা বানিয়েছি। সুতরাং দল-মতের হাজারো পাথ’ক্য থাকতে পারে তাকে দূরে রেখে সকল শিক্ষাংগন থেকে সকল মব এর বৃষ বৃক্ষ কত দ্রুত কিভাবে অপসারণ করা যায়, শিক্ষাংগনকে মানুষ গড়ার আংগিনায় রুপান্তর করা যায় তার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।এসব করতে প্রয়োজনে একাডেমিক কায'ক্রম ছাড়া রাজনৈতিক কম'কান্ড সহ নামে বেনামে সকল সাংগঠনিক কম’কান্ড নিষিদ্ধ করার কথা প্রয়োজনে ভাবতে হবে।
গুনীজনদের অভিমত একটা জাতিকে ধংস করতে এখন আর যুদ্ধের প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন নাই দেশ দখলের। তার শিক্ষা-সংস্কৃতি ধংস করতে হবে, সমাজকে মাদক ব্যাভিচারে ডুবিয়ে দিতে হবে।চারিদিকে তাকালে তার ছড়াছড়ি কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি।গত দেড় দশকে শিক্ষাকে নিয়ে বারবার কাটা-ছেড়া পোষ্টমটে’ম করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে ছাত্র-শিক্ষকদের হাতিয়ার বানিয়ে শিক্ষাকে ধংস করা হয়েছে।ছাত্ররা আজ অটোপাশের জন্য আন্দোলন করে, শিক্ষককে বহিস্কারের জন্য আন্দোলন করে । ছাত্ররা এখন পড়ার টেবিলে নাই, লাইব্রেরিতে নাই। ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের পর কিছু অনৈতিক সুবিধা দিয়ে কিছু ছাত্রনেতাদের বিপথগামী করে ধন- সম্পদের মালিক বানানো হয়েছে ।তাদের দেখিয়ে অন্যদের মাঝেও নেতা হবার উদগ্র বাসনা জাগিয়ে দেয়া হয়েছে। চারিদিকে তাকিয়ে আজ কেন জানি আশংকা জাগে কাদের ষড়যন্ত্রে আমাদের এই সোনার ছেলেরা পড়াশুনার টেবিলে না বসে, ক্লাসে না গিয়ে রাস্তায় নামছে, কথায় কথায় মব তৈরি করছে।শিক্ষককে অপমান করছে, সিনিয়রদের যাকে তাকে ট্যাগ দিয়ে অপদস্ত করছে, আইন হাতে নিয়ে অরাজক অবস্থা তৈরি করছে।তারা কোথায় থাকে কোথায় খায়?মিছিল মাইকিং এর কারা দেয় অথে’র যোগান ? আমাদের সোনার ছেলে-মেয়েদের ভবিষৎ,তাদের স্বপ্নকে ধংস করছে দেশের ভবিষৎ কান্ডারীদের ধংস করছে। জানতে চাই কারা সে বংশীবাদক কে পারবে ওদের অগ্রযাত্রা করতে পথরোধ ?
No comments:
Post a Comment