Friday, August 28, 2026

গাজায় গনহত্যার দায় মুসলিম রাষ্ট্র নায়কদের

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে আনুমানিক ৮১২ কোটি মানুষের ভেতর ওআইসি সদস্যদেশ হিসাবে পৃথিবীতে ৫৭টি মুসলিম দেশে প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের বসবাস ।অতি দুঃখের বিষয় প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে ভাতৃঘাতী হানাহানিতে লিপ্ত আজ।আরাফাত ময়দানের হযরত মুহাম্মদ (সা:) কর্তৃক প্রদত্ত বিদায়ী হজ্বের বাণী আমরা ভুলে গেছি। তিনি বলেছিলেন প্রত্যেক মুসলমান একে অপরের ভাই। তোমাদের প্রত্যেকের উপর প্রত্যেকের হক আছে।আজ আমরা সেই বানী ভুলে ইহুদী সাম্রাজ্যবাদীদের আপন করে নিয়েছি।আয়েসী জীবন-যাপনের ক্ষমতার মসনদ রক্ষাকারী বানিয়ে তাদের মন্ত্রনায় ভায়ে ভায়ে রক্তাত্ব হচ্ছি। কিন্তু ইতিহাস মনে করা আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল করি না তারা যে কখনো বন্ধু হতে পারেনা এখনো ভাবি না।

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ু-যুদ্ধের অবসানের পর আমেরিকা গোটা বিশ্বের পরাক্রমশালী রাষ্ট হিসাবে আবি’ভুত হয়। তখন থেকে ইসলাম এবং মুসলিমরা ইহুদী সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়।স্নায়ু-যুদ্ধের সময় আমেরিকা আর ইউরোপের দেশ গুলি শয়নে-স্বপনে লাল পতাকা দেখতো তাদের সামনে এখন চাঁদ তারা পতাকা । ইতিহাস বলে যখনই কোনো মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা তার জাতীকে মাথা উচু করে দাড়াবার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে তখনি তাকে ধংস করা হয়েছে।পশ্চীমা গনমাধ্যমও ইসলাম এবং তার অনুসারী মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসাবে প্রচার প্রচারণা করছে।বিশেষ করে ইজরাইলের জন্য হুমকী হলেই সেই দেশ এবং সেই জাতির নেতার যেন আর কোনো রক্ষা নাই।এভাবেই ধংস করা হয়েছে লিবিয়াকে,হত্যা করা হয়েছে জাতীয়তাবাদী নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফীকে।কট্ট্রর ইজরাইল বিরোধী ইরাকের জাতীয়তাবাদী নেতা সাদ্দাম হোসেনকে তার দেশের মানুষদের দিয়েই মুসলমানদের ঈদের দিনে ফাসী দেয়া হয়েছে, একসময়ের সম্পদশালী ইরাককে ধংস করা হয়েছে।আজ ইরানকে ধংস করার প্রচেষ্টা চলমান থাকা অবস্থায় হুমকী দেয়া হয়েছে পরবতি’ নিশানা পাকিস্তান ।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর হলোকাষ্ট থেকে বেচে আসা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে  আশ্রিত ইহুদীদের বৃটেনের অনুরোধে প্যালেস্টাইনে আশ্রয় দেয়া হয়। দিনে দিনে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে ফিলিস্তিনী ভুখন্ড দখল হতে থাকে।একসময় ইউরোপ আমেরিকার যোগসাজশে জাতিসংঘে ইজরাইল রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পায় কিন্তু ফিলিস্তিনীরা রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পায় নাই। শুরু হল ইউরোপ আমেরিকার সক্রিয় সহযোগীতায় ফিলিস্তিনীদের উপর ইহুদীদের অত্যাচার নিপীড়ন-নিযা’তন-হত্যা জবর দখল।ফিলিস্তিনীরা তাদের ভিটেমাটি থেকে বিতারিত হয়ে উদ্বাস্থ হতে থাকলো তাদের আবাস সংকুচীত হতে থাকলো, আর আশ্রিত ইহুদীরা সেই ভুমির মালিক হতে হতে  ইজরাইল রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারিত করতে থাকলো।আরব রাষ্ট্রগুলির নিস্ক্রিয়তা কখনো আবার বিশ্বাসঘাতকতায় আজকে বিশ্বের রক্তপিপাসু এক দানব রাষ্ট্র ইজরাইলের আত্মপ্রকাশ। ইচ্ছা এখন তাদের বৃহত্তর ইজরাইল রাষ্ট্র গড়ার।   

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর প্রত্যুষে হামাস ইজরাইলের অভ্যন্তরে আক্রমণ করে প্রায় চৌদ্দশত ইজরাইলীকে হতাহত করে এবং ২০০ এর অধিক সাধারণ এবং সামরিক সদস্যকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়।তথাকথিত সভ্য জগতের মানুষ, গণতন্ত্রের রক্ষাকারী, বাক-স্বাধীনতা রক্ষাকারী, মানবাধিকার রক্ষাকারীরা কেবল ফিলিস্তিনীদের  আক্রমণকে সন্ত্রাসী আক্রমণ করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে কিন্ত তারা হামাসের এই আক্রমণের মূল কারণ যুগের পর যুগ ধরে অত্যাচারিত নিপীড়িত নিযা’তিত ফিলিস্তীনিদের ক্ষোভের কথা প্রচার করে নাই।দীঘ’ ৭৫ বছরের অধিক সময় নিপীড়িত নিযা’তিত ফিলিস্তীনিরা তাদের রক্তের বিনিময়, তাদের ভুমির বিনিময়,আপনজন হারানোর শোক আর অমানবিক নিযা’তনের চোখের পানির বিনিময় আগ্রাসী বব’র ইজরাইলীদের কাছ থেকে অজি’ত শিক্ষার একই পদ্ধতিতে প্রতিশোধের এই আক্রমণে  ইজরাইলী সেনাবাহিনীর শ্রেষ্টত্ব ধুলায় মিশিয়ে দেয়। প্রতিশোধ নিতে আমেরিকা ও ইউরোপিয়ানদের সহযোগীতায় ইজরাইলীরা তাদের সব’শক্তি নিয়ে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে অভিযানে নামে।

প্রতিবেশি আরব দেশ সহ  দূরে কাছে ৫৭টি রাষ্ট্রের প্রায় ২০০ কোটি নামে-দাড়ী-টুপি-লেবাসে মুসলমানদের অনৈক্য আর নিস্ক্রীয়তায় বাধাহীন গাজায় নিব্বি’চারে গনহত্যা চালাতে তার অসুবিধা হয় নাই। যা এখনও  চলমান।আবাসিক এলাকা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ সকল চিকিৎসা কেন্দ্র,উপশানালয়,খাবার পানির ব্যবস্থা,বিদ্যুৎ ব্যবস্থা,পয়োনিস্কাশন ব্যবস্থা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।মানুষের মাথা গোজার ঠাই নাই,চিকিৎসার ব্যবস্থা নাই।,খাদ্যকে অস্ত্র বানিয়ে ক্ষুদাথ’ মানুষের খাদ্য-পানিয় ঔষধ সরবরাহ বন্ধ করে মানব ইতিহাসের নৃশংস পৈশাচিক গনহত্যা বন্ধে দানব রাষ্ট্র ইজরাইলকে নিবৃত করতে  সভ্য দুনিয়ার কারো কোনো ভুমিকা নাই। জাতিসংঘের কোনো ভুমিকা নাই, মেরুদন্ডহীন আরব লিগ, ওআইসির কোনো ক্ষমতা নাই।তারা কেবলই দাফতরিক বিবৃতি দেয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করেছে।জাতিসংঘে ইজরাইলের বিরুদ্ধে আনিত প্রস্তাব আমেরিকার ভেটোতে স্থগিত হয়,আন্তজা’তিক আদালতের রায় কায’কর হতে পারে না।ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার আর আহতদের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ ৮০ হাজার ছুয়েছে।শান্তি আলোচনার মাঝেও এখনো চলছে গনহত্যা।শোনা যাচ্ছে বত'মান সিরিয়া সরকারের সহযোগী তুরস্কের একটি প্রতিনিধি দল সিরিয়ার বিমান ঘাটি পরিদশ'নকালে ইজরাইল বিমান হামলা চালিয়ে বিমান ঘাটির ক্ষতি সাধন করেছে এবং বিবৃতি দিয়েছে ইজরাইল তার সীমান্তের কাছাকাছি ভীনদেশি কাউকে মেনে নেবে না।খুবই স্বাভাবিক।আমেরিকার ছত্রছায়ায় অপ্রতিরোধ্য রক্তপীপাসু দানব ইজরাইল যখন যাকে খুশী আক্রমণ করছে  মানবতা ধবংস করছে।সিরিয়া,লেবানন,ইরানকে আক্রমণ করে আমেরিকার সহযোগীতায় ট্রাম্পের হামাসকে দেয়া হুমকীর সেই দোজখের আগুন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নামিয়ে আনছে।

বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানই পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে রিয়াদে সৌদিআরব ও পাকিস্তানের ভেতর একটা কৌশলগত পারস্পারিক সহযোগীতা চুক্তি সম্পাদিত হয়।এবার ২০২৬ সালের আগষ্টে যৌথভাবে আমেরিকা-ইজরাইলের ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের পাচ মাস পর মক্কায়  সৌদিআরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ভেতর আরও একটি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটা চুক্তি সম্পাদন হয়েছে।উদ্দেশ্য এই চুক্তিভুক্ত কোনো সদস্য দেশের উপর আক্রমণ হলে তা তিন দেশের উপর আক্রমণ হিসাবে বিবেচীত হবে।বত’মান অবস্থায় এই চুক্তি মুসলিম উম্মাহর উপকার হবার কোনো আলামত নাই বরং ভাতৃঘাতী হানাহানিতে অধিক রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ার আশংকা আছে। কারন প্রতিবেশি মুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থিত বিদেশি ঘাটি থেকে ইরানে আক্রমণ করায় ইরান এবং ইয়ামেনের হুতিরা সে সমস্ত ঘাটিতে আক্রমণ করছে।তারমধ্যে সৌদি আরব আছে।তাহলে সৌদি আরবে বিদেশি ঘাটি থেকে আক্রান্ত ইরান পাল্টা আক্রমণ করলে কি পাকিস্তান ও তুরস্ক ইরানকে আক্রমণ করবে ? ইজরাইল যদি পাকিস্তান অথবা তুরস্ককে আক্রমণ করে সৌদি আরবে  মাকি'ন ঘাটি রেখে সৌদি আরব কি পারবে চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান অথবা তুরস্কের পাশে দাড়িয়ে ইজরাইলকে আক্রমণ করতে? 

তাই গোত্রে গোত্রে জোট নয় এই মুহুত্তে’ প্রয়োজন ওআইসি সদস্যদেশ মিলে জোট গঠন এবং ন্যাটোর মতো একটা যৌথ মুসলিম বাহিনী গঠন করা।নিজেদের মাঝে সমস্যা থাকবে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। এখনই ভুলে যেতে হবে কে শিয়া, কে সুন্নী , কে সালাফী, কে হানাফী, কে মাঝহাবী কে ওহাবি সকল বিভেদ।কারন যারা আল্লাহ মানেন, কুরআন মানেন রাসুল মানেন উদ্দেশ্য যখন সবার আল-আকসা উদ্ধার করা সেখানে কি আছে আমাদের যোগ্যতা বিভেদ করার ?  ইসলামের আদেশ মজলুমের পাশে দাড়াবার।পছন্দের নয় কিন্তু মজলুম এক ভাইকে রক্ত-পিপাসু দানবের হাতে নিপীড়িত দেখে কেন নিস্ক্রিয় কিংবা উল্লসিত হতে হবে ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য মুসলিম দেশ গুলির একের সাথে অন্যের বিভেদ হানাহানী বাধিয়ে একে একে সবাইকে দুব’ল করে জ্বালানী সম্পদ দখল করা। ইজরাইলের প্রতিপক্ষ হামাস হিজবুল্লাহকে দুব’লকরা হয়েছে, ইরানের দোসর সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন হয়েছে।বত’মানে দৃশ্যমান শক্তিশালী ইরানকে ছলে-বলে কৌশলে শেষ করতে পারলে আরব-পারস্য সাম্রাজ্য করায়ত্ব করে বৃহত্তর ইজরাইল রাষ্ট্র গড়া তাদের কেবল সময়ের ব্যপার।

এখনই সময় সব বিভেদ ভুলে আগ্রাসী ইহুদী সাম্রাজ্যবাদীদের রুখতে আজকের মজলুম ইরানের পাশে দাড়াতে হবে।আরবের মাটি থেকে সকল বিদেশি ঘাটি উচ্ছেদ করতে হবে কারণ তারা আরবদের রক্ষায় নয় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানীর অধিকার নিতে আর ইজরাইলকে নিরাপত্তা দিতে আরব দেশে ঘাটি গেড়েছে ।বড় কথা ইরানের আক্রমণ থেকে যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে নাই তারা আরবদের রক্ষা করবে কিভাবে? ফিলিস্তিনী  হামাস যুদ্ধ শুধু ইজরাইলের সাথে করে নাই তারাযুদ্ধ করেছে পরাক্রমশালী আমেরিকা ও ইউরোপিয়ানদের সাথে। আরব দেশ গুলি এক হয়ে যদি ফিলিস্তিনীদের পাশে দাঁড়িয়ে রক্তপিপাসু দানব ইজরাইলকে প্রতিহত করতো, কোনো ভাবেই গাজায় গণহত্যা হতো না।তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়  আরবদের  অনৈক্যের সুযোগে ফাকা মাঠে প্রশ্রয় পাওয়া ছোট্ট একটা দেশ ইজরাইল রক্ত-পিপাসু দানব  হয়ে  গাজায় গনহত্যার দায় মুসলিম রাষ্ট্র নায়কদের।