আমেরিকা তার মিত্র ইসরাইলকে দিয়ে আগ্রাসন চালিয়ে আরব ভুমিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে রেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হলোকাষ্ট থেকে বেচে ইউরোপে আসা ইহুদীদের প্যালেষ্টাইনে আশ্রয় দেয়ার দিন থেকে । রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হলেও ইসরাইলের প্রতি আমেরিকার নীতির কোনো পরির্বতন কখনো হয় নাই। তাই ইসরাইলের আগ্রাসন বিরামহীন চলমান যুগ যুগ ধরে । তবে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ব্যবসায়ী ট্রাম্পের কাছে গাজার সমুদ্রতীর বড় বেশী প্রয়োজন। তাই অক্টোবর, ২০২৩ সালে সুদীর্ঘ ৭৫ বছরের অধিক রক্তপিপাসু দানব ইসরাইলীদের হত্যা-নির্যাতন, ভুমিদখল, আগ্রাসনের প্রতিশোধ নিতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইজরাইলের অভ্যন্তরে আক্রমণ করে। সেই হামলাকে ইস্যু বানিয়ে আমেরিকার পূর্ণ সহযোগীতায় ইজরাইল তার সর্ব্বশক্তি দিয়ে গাজায় গনহত্যা শুরু করে, যা আজও চলমান। এই যুদ্ধে আনুমানিক প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনী নিহত, প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার আহত, প্রায় ২০ লক্ষ ফিলিস্তিনী বাস্ত্যচুত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় , চিকিৎসাকেন্দ্র, পানি-শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ নাগরিকের নিত্য অতি আবশ্যক প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস প্রায়।
ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়ামেনের হুতি ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে সহযোগীতা ও পরমানু গবেষনা চলমান রাখার অজুহাতে চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে " অপারেশন এপিক ফিঊরি " নামে ইরানে সরাসরি সামারিক আগ্রাসন শুরু করে। আক্রমণের প্রথম দিনেই ইরানের সর্ব্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমিনী সহ উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী এবং একই স্কুলের কয়েকশত শিশু সহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ আহত নিহত হয়। পাল্টা আক্রমনে ইরান প্রতিবেশী আরব রাস্ট্রে অবস্থিত আমেরিকার বিভিন্ন সামারিক ঘাটি ও ইজরাইলে আক্রমণে করে ব্যপক ক্ষতি সাধন করে। এভাবে থেমে থেমে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে আমেরিকার গোলাবারুদের ঘাটতি পুরনের জন্য ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয় । এভাবে ইরানের উপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ এখনো চলমান।
"ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল" এর তথ্যমতে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটা যুদ্ধবিরতির আশায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং পারমাণবিক বিষয় আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে গত কিছুদিন আগে ইরান সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় । আশা ইরানের বন্দর গুলোর উপর যুক্তরাস্ট্রের আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে যা দেশটির অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতি করছে। ট্রাম্প সেই প্রস্তাব নাকচ করে আগামী নভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে ও ইরানে বোমা হামলা করার আশা করছেন এবং ইরানের উপর চলমান সামুদ্রিক অবরোধ তোলার কোন প্রকার আশা করছেন না জানিয়েছেন। ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করতে চান না কারণ পরিস্থিতি এখন সম্পুর্ন আমেরিকার অনুকূলে। অবশ্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কোনো চুক্তি না হলে তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের ওই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাকে একটি 'বড় সিদ্ধান্ত' নিতে হবে। শোনা যাচ্ছে ইরানে আক্রমণের জন্য ইতিমধ্যে ন্যাটোকে প্রস্তুতি নেবার নিদ্দে’শ দেয়া হয়েছে । এদিকে ইরানও তার সর্ব্বশক্তি নিয়ে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।
এই মুহুর্ত্তে প্রয়োজন ছিল আরব দেশগুলির ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরাইলের আগ্রাসন বন্ধ করে হরমুজ প্রনালী চালু করার ব্যবস্থা নেয়া। কারণ ইরান আমেরিকার পাল্টা-পাল্টি আক্রমণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ সকল পন্য পরিবহন বন্ধ । ফলে সারা বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া নিজেদের দেশের ভেতরে থাকা আমেরিকান ঘাটি ব্যাবহার করে ইরানে আক্রমণ করায় ইরানের পাল্টা আক্রমণে প্রতিবেশি নিজেদের দেশ গুলিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে জ্বালানি রফতানী বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে হচ্ছে । ইয়ামেনের বিদ্রোহী হুতিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিলে ওই দিনই সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট পূর্ণমাত্রায় পাল্টা আক্রমণ শুরু করায় ইয়ামেনের বিদ্রোহী হুতিরা সরাসরি সৌদি স্থাপনায় পাল্টা আক্রমণ জোরদার করার মাধ্যমে আরব দেশগুলি ঐক্যবদ্ধ হবার সম্ভাবনা নাই বলা যায়। আরব রাষ্ট্র গুলি যখন নিরপেক্ষ থেকে গাজায় গনহত্যায় ইজরাইলীদের ওয়াক ওভার পাওয়ার সু্যোগ দিয়েছে তখন হুতিরা গাযায় গনহত্যার প্রতিশোধে ইজরাইলে ক্ষেপণাস্র ছুড়েছে। লোহিত সাগরে ইজরাইলগামী জাহাজে আক্রমণ করেছে।ও আই সি আরবলীগ গাজা গনহত্যায় কিছু করতে পারে নাই, ইরানে আমেরিকার আগ্রাসনে করার কিছু নাই, সিরিয়ায় ও লেবাননে ইজরাইলের আক্রমণেও করার কিছুই নাই নিজেদের সংঘঠনের সদস্যদের ভেতর আত্মঘাতী-ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসনের ক্ষমতাহীন শুধু লিপ সার্ভিস দেয়া প্রতিষ্টানের প্রয়োজন কি ?
ইয়ামেনের বিদ্রোহী হুতিরা ২০১৪ সালে ইয়ামেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ফলে জাতিসংঘ স্বীকৃত ইয়ামেন সরকার এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট এবং ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাঝে দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। শিয়া মতাবলম্বী হুথি বিদ্রোহীরা শিয়া-প্রধান দেশ ইরানের কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্রের সহায়তা পেয়ে শক্তিশালী হয়ে দশক ধরে ইয়ামেনের সুন্নি গোষ্ঠীগুলোর সাথে তীব্র সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে।'দ্য গার্ডিয়ান' ও অন্যান্য সূত্রের তথ্যমতে, জোট বাহিনী লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীর উত্তরাঞ্চলীয় কৌশলগত পয়েন্টগুলো—যেমন দুবা, বাব ও হোদাইদাহ—পুনরুদ্ধার করেছে। শোনা যায় শত শত সৌদি বিমান হামলায় হোদাইদাহতে হুথিদের বিভিন্ন অবস্থান ও অস্ত্র গুদামগুলো ধ্বংস করেছে। হুথিদের তৃতীয় বারের পাল্টা হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছে । নিহত ১২ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক আছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ এ আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে এবং মক্কা-মদিনায় মুসলিম উম্মাহর অত্যন্ত পবিত্র আবেগের স্থান এখানে কোন আক্রমণ মুসলিম উম্মাহ মেনে নেবে না জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তান দ্রুত সেখানে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতকে আরও তীব্রতার দিকে ঠেলে দেয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। শোনা যায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিনটি সুন্নি ইসলামি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সৌদি রাজধানী রিয়াদে মক্কা জোটের জরুরি ভাবে আক্রমণ প্রতিহত করার কৌশল, রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক আলোচনার জন্য বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তাঁরা অতিদ্রুত যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, এবং দ্রুত সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার ঘোষণা দিয়েছেন। স্মরণ করা প্রয়োজন গত ৭ই আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় তিনটি দেশ ন্যাটোর আদলে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল চুক্তিবদ্ধ তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। তাঁরা সৌদি আরবের ওপর হামলা এবং ইসলামের পবিত্র স্থান মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।পর্যবেক্ষকদের মতে—" ন্যাটো (NATO)-র আদলে গঠিত ইসলামি জোট " এখন যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে এবং তাদের সক্ষমতা পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে।
আমরা দেখেছি ইজরাইলের গাজায় গনহত্যায় কোনো জোটের কোনো ভুমিকা নাই। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর ইজরাইল সিরিয়ায় বিমান হামলা চালিয়ে সমস্ত সামরিক স্থাপনা,অস্ত্রাগার বিমান বন্দর ধবংস করে গোলানের বেশ কিছু জায়গা দখলে নিয়েছে সেখানে কারো কোনো ভুমিকা নাই। ইজরাইল লেবাননে নারকীয় ধবংসজজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তাকে রুখবার কেউ নাই। ইয়ামেনের বিদ্রোহী হুতি আর সরকারী বাহিনীর মাঝে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করার চেষ্টা না করে যুদ্ধরত একটা পক্ষকে সহযোগীতা করে সংঘাতকে বেগবান করা কেন ? ইয়ামেনের হুতিরা পাকিস্তানকে তাদের উপর বিমান হামলার প্রশ্ন তুলেছে।যদি সত্যি হয় তাতে ইরান পাকিস্তানের সম্পর্কে টান পড়তে পারে। স্মরণ করা প্রয়োজন ইরান, ইরানের সমর্থণপুষ্ট ইয়ামেনের বিদ্রোহী হুতি, ফিলিস্তিনী হামাস ও হিজবুল্লাহ সবাই ইউরোপ-আমেরিকান ও ইজরাইলের শত্রু। তাদের স্বপ্ন আছে বৃহত্তর ইজরাইলী রাস্ট্র গড়ার ।
শোনা যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় প্রায় ৭৭টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধি দল প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলেও ৭টি মুসলিম প্রধান দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত , বাহরাইন, মরক্কো, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, আলবেনিয়া, সেনেগাল অধিবেশন ত্যাগ করে নাই।কিছুদিন আগে ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানাহু অতি গোপনে আরব-আমিরাত ঘুরে গেছে। ট্রাম্প চুক্তি না হলে ইরানকে ধবংস করার হুমকির মাঝে সময় এখন আল্লাহকে মানে, কুরআন মানে নবী রাসুল মানে কিন্তু ভিন্নমতের মজলুম ভাইয়ের পাশে দাড়াবার। প্রয়োজন নিরপেক্ষ ভাবে আলোচনার টেবিলে ইয়ামেনের ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা করা। কারণ কে মুসলিম আর কে মুসলিম না আল্লাহ ছাড়া আজকের ভোগবাদী নামে দাড়ী-টুপি লেবাসে কোন মুসলমানের সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা আছে মনে হয় না। সবাইকে এখন ভাবতে হবে মুসলিম রাষ্ট্র গুলি বিভক্ত হয়ে একে অপরের সাথে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লাভবান হচ্ছে কে ?
No comments:
Post a Comment